টানা লোকসানে আমদানিতে অনাগ্রহী ছিলেন ব্যবসায়ীরা

কোরবানির আগে অস্থিতিশীল আদার বাজার

দেশে পচনশীল মসলাপণ্য আদা স্বাভাবিক চাহিদার দ্বিগুণ লেনদেন হয় ঈদুল আজহার বাজারে। দেশে উৎপাদন হলেও ৪০-৫০ শতাংশ আমদানিনির্ভরতায় বিভিন্ন সময় অস্থিতিশীল থাকে পণ্যটির বাজার।

কয়েক মাস ধরে দাম টানা নিম্নমুখী থাকায় আমদানিকারকদের বড় অংশ নতুন করে ঋণপত্র (এলসি) খুলতে অনাগ্রহী ছিলেন। এতে আমদানি কমে কোরবানির ঠিক আগমুহূর্তে সরবরাহ সংকটে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে পণ্যটির বাজার। এরই মধ্যে এক সপ্তাহের ব্যবধানে আদার পাইকারি

দাম বেড়েছে কেজিতে ৭০-৮০ টাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশীয় আদার মজুদ কমে আসা, আগাম বৃষ্টিতে পণ্য নষ্ট হওয়া এবং আমদানি কমে যাওয়ায় সংকট তীব্র হয়েছে। ফলে ঈদের আগে গুরুত্বপূর্ণ এ মসলাপণ্যের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি কেজি আমদানীকৃত আদা পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ১৮০-১৯০ টাকায়। এক সপ্তাহ আগেও একই মানের আদার দাম ছিল কেজিপ্রতি ১১০-১২০ টাকা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশে আদার চাহিদা কম-বেশি পাঁচ লাখ টন। সর্বশেষ কয়েক বছর ধরে গড়ে তিন লাখ টনের মতো আদা উৎপাদন হয়। আমদানি হয় দুই লাখ টনের মতো। কয়েক মাস ধরে দেশের বাজারে প্রতি কেজি আদার পাইকারি দাম ছিল সর্বনিম্ন ৮০-১১০ টাকা। বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ার পরও দেশে আদা ব্যবসায় লাভ করতে না পারায় অনেকেই এলসি খোলেনি। যে কারণে চলতি কোরবানির ঈদের আগে আদার সাময়িক সরবরাহ সংকট পণ্যটির দাম উসকে দিয়েছে।

খাতুনগঞ্জের মেসার্স বিসমিল্লাহ বাণিজ্যালয়ের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানিয়েছেন, আদার দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে হঠাৎ বেড়ে গেছে। বাজারে দেশীয় আদার সরবরাহ কমে গেছে। আমদানিকারকরাও সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। তাছাড়া দীর্ঘদিন লোকসানে থাকায় অনেক আমদানিকারকই আদার এলসি করেনি। এতে কোরবানির আগে কেজিপ্রতি আদার দাম ৬০-৭০ টাকা বেড়ে গেছে। সরবরাহ না বাড়লে ঈদের আগে দাম আরো অস্থিতিশীল হওয়ার শঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

একসময় চীন, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার থেকেও আদা আমদানি হতো। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের কারণে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে আমদানি-রফতানি কার্যত বন্ধ। আবার খরচ পোষাতে না পেরে বিকল্প দেশগুলো থেকেও আদা আসছে না। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে চীন থেকে আকারে মোটা আদা দেশে আমদানি হয়ে আসছে। দেশের পার্বত্য তিন জেলা ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় উৎপাদিত আদার সরবরাহও কোরবানির আগে সীমিত হয়ে যাওয়ায় আমদানি আদার চাহিদা ও দাম দুটোই বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকায় গত বৃহস্পতিবার আমদানীকৃত চীনা আদার প্রতি কেজির দাম ছিল ১৫০ থেকে ১৯০ টাকা। গতকাল থেকে পাইকারি বাজারে আদার দাম বেড়ে যাওয়ায় আজ থেকে খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন মসলা ব্যবসায়ীরা। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দৈনিক বাজারদর প্রতিবেদনেও প্রতি কেজি আমদানি আদার বাজার ১৫০ থেকে ২০০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদুল আজহায় মাংস রান্নায় পেঁয়াজ-রসুনের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি পরিমাণ মসলাপণ্য হিসেবে আদা ব্যবহৃত হয়। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ঈদে আদার ব্যবহার দ্বিগুণেরও বেশি হওয়ায় চাপ বেড়ে যায়। এ কারণে দামও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। দেশীয় পরিপক্ব আদা দীর্ঘ সময় সংরক্ষণযোগ্য হলেও আমদানীকৃত আদা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কনটেইনারে করে আমদানি হওয়ায় বন্দর থেকে খালাসের পর দ্রুত বিক্রি করতে হয়। তাছাড়া দীর্ঘ সময় রেখে বিক্রয় করতে হলে এ আদা সার্বক্ষণিক ঠান্ডা ও খোলামেলা পরিবেশে সংরক্ষণ করতে হয়। এ কারণে বছরের অনেক সময় তুলনামূলক কম দামে আদা বিক্রি করতে বাধ্য হন আমদানিকারকরা। তবে কোরবানির ঈদকে ঘিরে চাহিদা বেড়ে গেলে দাম বাড়িয়ে বাড়তি মুনাফা হাতিয়ে নেন ব্যবসায়ীরা।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, আদার মতো পচনশীল মসলাপণ্যের দাম চাহিদার মৌসুমে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। প্রতি বছর কোরবানির ঈদের আগে আদার বাজারেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়। দেশে পেঁয়াজের মতো মসলাপণ্যের বাজার নিয়ে সরকার তুলনামূলক বেশি মনোযোগী হলেও আদা ও রসুনের বাজার নিয়ে ততটা কার্যকর নজরদারি নেই বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন লোকসান থাকায় অনেক আমদানিকারক ব্যবসা থেকে সরে গেছেন বা আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে সরবরাহ কমে যাওয়ায় যারা এখনো আমদানি অব্যাহত রেখেছেন, তারা বাড়তি দামে আদা বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন। এছাড়া আগে মিয়ানমারসহ একাধিক বিকল্প দেশ থেকে আদা আমদানি হলেও বর্তমানে সেই সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এ মসলাপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।

খুচরা বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক দিনের মধ্যে খুচরায় প্রতি কেজি আদার দাম বেড়েছে ৩০-৪০ টাকা। বর্তমানে মানভেদে প্রতি কেজি আদা ২০০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মোকাম থেকে সংগ্রহ করার পর ক্রয় করা আদার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পচা বা মানহীন থাকায় পাইকারি মূল্যের সঙ্গে বড় ব্যবধান রেখেই আদা বিক্রি করতে হয় খুচরা বিক্রেতাদের। এজন্য পাইকারিতে দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খুচরা বাজারেও আদার দাম দেড় গুণ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

আরও